বাংলা বানান ভাবনা

লেখক :
ভারতবর্ষীয় ভাষাসমূহের মধ্যে বাংলায় সর্বাধিক সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে৷ নোবেল প্রাইজের মতো সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য সাহিত্যিক বাংলায় অনেকেই ছিলেন, যদিও শুধু রবীন্দ্রনাথই এই সম্মান পেয়েছেন৷ রবীন্দ্রনাথ নিজের গানগুলো ইংরেজিতে নিজেই অনুবাদ করে বিশ্বদরবারে পৌঁছিয়েছেন, অন্য লেখকেরা তা করেননি৷ সম্ভবত এই কারণেই বাংলার অন্যান্য সেরা সাহিত্যগুলো বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে পৌঁছায়নি৷ বিগত কয়েক বছরের নোবেল প্রাপ্ত সাহিত্যকর্মগুলোর চেয়ে আমাদের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা কোন অংশে কম নয়৷ এটা আমার নিজের মত, অভিজ্ঞ সাহিত্যবোদ্ধারা ভালো বলতে পারবেন৷
বাংলা সাহিত্যের এহেন অবস্থার পরও নবীন পাকিস্তানে বাংলা ভাষার উপর নেমে আসে সরকারী আদেশের খড়্গহস্ত৷ একই ঘটনা আমরা লক্ষ্য করেছি আসামেও৷ দুটি ভিন্ন সময়ে হলেও ঘটনাগুলো বাঙালীর বিস্মৃত হওয়ার মতো নয়৷
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্ন নয়, বাংলা ভাষা ফারসী বর্ণে লেখার মতো ষড়যন্ত্রও হয়েছে পাকিস্তানে৷ সবাই জানেন, বর্তমান পাকিস্তানে প্রচলিত সকল ভাষাই ফারসী বর্ণে লিখিত হয়ে থাকে৷ যদি বাংলাও ফারসী বর্ণে লেখার প্রচলন হয়ে যেত তবে পাঞ্জাবীর মতো আজ পূর্ব-পশ্চিমের বাংলাও বর্ণ ও উচ্চারণে দুই ভিন্ন ভাষায় পরিণত হতো৷ এটা আমাদের জন্য শুভকার্য হতো না৷
১৯৩৫ সালে বাংলা বানানের নিয়ম প্রণীত হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নিয়ম প্রণীত হওয়ার আগেই সম্মতি জানিয়ে রেখেছিলেন নতুন নিয়মের প্রতি৷ বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হলেও বাংলা বানান প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের সকল পরামর্শ মেনে নিতে হবে এমন হতে পারে না৷ এবং ১৯৩৫ সালে প্রণীত বানান রীতি রবীন্দ্রনাথও পুরোপুরি অনুসরণ করেননি৷ তাঁর প্রয়াণের পর প্রকাশিত সঙ্কলনগুলোতে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে৷
নবীন পাকিস্তানের সরকারী ভাষা প্রশ্ন পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই উঠেছিল৷ বাঙালী মুসলমানদের এক অংশ উর্দুকে যেমন পাকিস্তানের ভাষার প্রস্তাব করেছিলেন, তেমনি বাঙালী হিন্দুদের কেউ কেউ ভারতের ভাষা হিসেবে হিন্দির প্রস্তাব করেছিল৷ এই কাতারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও রয়েছেন৷ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তো একধাপ এগিয়ে বাংলা ভাষাকে রোমান বর্ণে লেখার প্রস্তাবও করেছিলেন৷ তাদের রচিত গ্রন্থগুলোতে এই বিষয়ে ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে৷
বাংলাদেশে সরকারীভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, বাংলা একাডেমি প্রণীত (মূলত বাংলা একাডেমি প্রণীত নয়, বরং ১৯৩৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাদেমি কর্তৃক সংস্কারকৃত) প্রমিত বানানের নিয়ম অনুসরণ করেই বাংলা লিখিত হবে৷ আমরা প্রমিত বানানের রীতিকে সাদরে গ্রহন করতে পারতাম, কিন্তু সঙ্গত কিছু কারণে পারছি না৷ এই না-পারার কারণগুলো আমি সংক্ষেপে আলোচনা করবো৷ শুবাচে এতবড় আলোচনা পাঠক পড়বেন কিনা জানি না, তবুও শুদ্ধবানান চর্চার ফ্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুবাচ আমার কাছে আদর্শ৷ বাংলা একাডেমির কেউ আমার আলোচনা না দেখলেও শুবাচে বিজ্ঞলোকের অভাব নেই৷
প্রমিতবানানের নিয়মের প্রথম অসঙ্গতি হচ্ছে, বাংলা শব্দকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা৷ আমরা বাংলা শব্দভাণ্ডারকে শুধুই বাংলা শব্দভাণ্ডার বলে মান্য করতে চাই৷ বাংলায় ব্যবহৃত সকল শব্দই বাংলা, এদের উৎস কী সেটা আদৌ বিবেচনাযোগ্য বিষয় নয়৷
বাংলায় ব্যবহৃত শব্দগুলো একটি একক বানানরীতে লেখা হবে৷ বাংলা শব্দে ভারতবর্ষে কয়েক শতাব্দী দীর্ঘ অনাচার ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্রের মতো জাতিভেদ তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশী ও বিদেশী বলে বিভাজন মানতে পারছি না৷ এটা অবশ্যই বাংলা শব্দভাণ্ডারের জন্য সুফলদায়ক নয়৷
দ্বিতীয়ত, মূলভাষাতে যেমনই থাকুক, বাংলা শব্দগুলো বাংলায় এসে নতুন একটি রূপ পরিগ্রহ করেছে৷ দুই চারটি শব্দ হয়তো বদলায় নি, কিন্তু বেশির ভাগ শব্দই বাংলায় এসে রূপে ও অর্থে বদলে গেছে৷ তাই যে উৎস থেকেই আসুক না কেন, বাংলা শব্দকে একটি অভিন্ন পদ্ধতিতে বানান করতে হবে৷
বাংলা সংস্কৃত বা সাধু বাংলার মতো পণ্ডিতদের ভাষা নয়, কৃষক ও কারিগর এই জাতীয় শ্রমজীবি মানুষের ভাষা৷ আমরা বাংলার এইরূপটিকেই আদর্শরূপ গণ্য করি৷ সাধুভাষা বর্জিত হয়েছে, আমরা মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি প্রাকৃত চলিতভাষাকে আদর্শ বাংলা বলে গণ্য করেছি৷
বাংলা বানান স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এটা আদর্শরূপে এসে দাঁড়িয়েছে, আঠারো শতকের বাঙালী লেখকেরা টি পদাশ্রিত নির্দেশকটিকে টী লিখতেন, কোন নিয়ম তৈরী না করেই আমরা টি লিখেত শুরু করেছি৷ আরবী ফারসী শব্দগুলোরও একটা আদর্শরূপ তৈরি হয়ে গেছে৷ একসময় আরবী শব্দ عبادة -এর বাংলা প্রতিবর্ণায়ণ হতো এবাদত, ইবাদত, এখন আমরা ইবাদত লিখছি৷ অনুরূপ এসলাম, ইসলাম থেকে ইসলামে আমরা স্থির হয়েছি৷ এইসব কোন নিয়ম আমাদের করতে বাধ্য করেনি, প্রাকৃতিকভাবেই হয়ে গেছে৷
আলোচনা দীর্ঘ হচ্ছে, তাই সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি কথা বলে শেষ করবো৷
  • বাংলা শব্দের বানান করার ক্ষেত্রে কোনরূপ জাতিভেদ না করে একই অভিন্ন বানান অনুসরণ করতে হবে৷
  • বাংলা বর্ণে কোনরূপ জাতিভেদ কারা যাবে না৷ স্বভাবসিদ্ধভাবে যে বর্ণটি যে শব্দে খাটে সেটিকেই গ্রহন করতে হবে৷
  • ণত্ব-বিধি, ষত্ব-বিধি, লিঙ্গান্তর, বচন, সন্ধি ইত্যাদিতে একই বানানরীতি প্রয়োগ করতে হবে৷
  • বাংলায় দীর্ঘস্বর ব্যবহৃত হয় না, এই যুক্তিটি হাস্যকর৷ আমার ধারণা, একাডেমির পণ্ডিতেরা বাংলার বিভিন্ন উপভাষা সম্পর্কে অথবা সাধারণ মানুষের কথা বলার ভঙ্গিটি কখনো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেননি৷ বিশেষ করে আরবী-ফারসী শব্দগুলো বাঙালী মুসলমানেরা কেমন করে উচ্চারণ করে তারা সেটা জানেন না৷ আমরা হয়তো সংস্কৃত বা আরবী, ফারসীর মতো দীর্ঘ উচ্চারণ করি না, তবু একেবারেই যে হ্রস করি তাও নয়৷
  • তৎসম শব্দে ঈ, ঊ, ঋ, ণ, ষ, য, য় ব্যবহার করতে পারলে অন্য শব্দগুলোতে কেন পারবো না৷ অথবা অন্য শব্দগুলো থেকে এই বর্ণগুলোকে বর্জন করলে তৎসম শব্দে কেন পারবো না? এই প্রশ্নের সুযোগ রাখা যাবে না, যদিও আমরা কোন বর্ণ বর্জনের পক্ষপাতি নই৷
  • বাংলা শব্দভাণ্ডারে ব্যবহৃত আরবী, ফারসী ও ইংরেজি শব্দের সঠিক উচ্চারণ করতে অন্তঃস্থ ব (ৱ) বর্ণটিকে পুনর্বহাল করা যেতে পারে এটির মূল উচ্চারণে এবং ভিন্ন আকৃতিতে৷ অন্তঃস্থ ব-এর আকৃতি বর্গীয় ব-য়ের মতো হবে না, বরং অসমিয়া অন্তঃস্থ ৱ-টিকে বাংলায় গ্রহণ করা যেতে পারে৷
অবশ্যই বাংলা ও অসিমিয়া পণ্ডিতগণ ঐক্যমতের ভিত্তিতে বাংলা র ও অসমিয়া ৰ এই দুটি রূপের যেকোন একটি রূপকে র হিসেবে গ্রহন করতে পারেন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *