বাংলা বর্ণ ও বানান ভাবনা

লেখক :
বাংলাকে বাংলার মতো করার দাবি বাঙালির। এর মানে কী? বাংলাকে সংস্কৃতের খাঁচা হতে বের করে আনতে হবে এটাই তো? উদ্যোগটা ভালো।
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাংলায় আশি শতাংশের বেশি শব্দ সংস্কৃত। আমরা কি রাতারাতি এইসকল শব্দকে পাল্টে দিবো? কিভাবে আমরা বাংলাকে বাংলার মতো করবো?
বেশির ভাগ ব্যবহারকারীর মতে, বাংলা ভাষা থেকে কিছু বর্ণ তুলে দিতে হবে। এই ভয়ঙ্কর খেলাটি একসময় আমিও খেলেছি। তখন কম্পিউটারের এত প্রচলন হয়নি। টাইপরাইটারে বাংলা টাইপ করতে গিয়ে মনে হলো ইংরেজির মতো বাংলাকেও কেন ছাব্বিশটি বর্ণে লেখা সম্ভব হবে না?
বাংলা স্বরবর্ণ থেকে ঈ, ঊ, ঋ, ঐ, ঔ তুলে দিলে কোন সমস্যা দেখিনি। ব্যঞ্জণবর্ণের মহাপ্রাণ বর্ণগুলো তুলে দেওয়া যায় নতুন একটি চিহ্ন সৃষ্টি করলে। যাতে অল্পপ্রাণ বর্ণের সাথে সেই চিহ্নটি ব্যবহার করলে আমরা মহাপ্রাণ উচ্চারণ করতে পারি। ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ঁ এই সবগুলোর জন্য শুধু ঁ রাখলেই হয়ে যায়। আমি নিয়ম তৈরি করেছিলাম, ঁ ক-বর্গের আগে এলে ঙ, চ-বর্গের আগে এলে ঞ, ট-বর্গের আগে এলে ণ, ত-বর্গের আগে এলে ন, প-বর্গের আগে এলে ম এভাবেই উচ্চারিত হবে।
শ, ষ, স এই তিনটির জন্য আমরা মাত্র স রাখবো, এবং স-এর সাথে অল্পপ্রাণ বর্ণকে মহাপ্রাণ করার চিহ্নটি ব্যবহার করলে শ, ষ উচ্চারণ করা যাবে। কোথায় শ হবে, কোথায় ষ হবে সেটা নির্ধারণ করবে ষত্ববিধান।
অ, ই, উ, এ, ও এই পাঁচটি স্বরবর্ণ।
ক, গ, চ, জ, ট, ড, ত, দ, প, ব, র, ল, স, হ, এবং নবসৃষ্ট বিশেষ বর্ণ।
এভাবে মাত্র বিশটি বর্ণে বাংলা লেখা সম্ভব। এছাড়া ফলা ও যুক্তবর্ণ থাকবে না। কারচিহ্ন বিশেষ ভাবে তৈরি হবে, তবে এগুলো কখনো বর্ণের আগে আসবে না, পরেই আসবে। প্রথম প্রথম বিভ্রান্তি লাগলেও ধীরে ধীরে আমরা এতেই অভ্যস্ত হয়ে যাবো।
বহুদিন পর মনে হলো, বর্ণ কমালেই ভাষার সমস্যা যাবে না। কখনো কখনো আরও কিছু বর্ণ যোগ করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রবাসে এসে, আরও একাধিক ভাষার সংস্পর্শে এসে অনুধাবন করলাম, বর্ণ এবং বানানের সমস্যা শুধু বাংলায় নয়, পৃথিবীর একটি ভাষাও নেই যাতে এই সমস্যা নেই।
এই সমস্যার কারণ কী? একটাই কারণ, প্রাকৃতিকভাবেই মানুষের উচ্চারণ বদলে যাওয়া। এভাবে উচ্চারণ বদলের যাওয়া কখনো থামবে না, তাই উচ্চারণকে গুরুত্ব দেওয়ার দরকারও নেই। বরং যেখানে যেভাবে যে বর্ণটি উচ্চারিত হতে থাকে সেভাবেই হতে দেওয়া উচিত।
বাংলাভাষী বিভিন্ন অঞ্চলের একই বর্ণের বিভিন্ন উচ্চারণ লক্ষ্যণীয়। আমরা প্রতিটি অঞ্চলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন চিহ্ন তৈরি করতে পারি না। আমরা একই চিহ্নের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের উচ্চারণকে মেনে নিবো।
বাংলা ল বর্ণটি কোথাও কোথাও ন উচ্চারিত হয়, আবার ন বর্ণটি কোথাও কোথাও ল উচ্চারিত হয়। প, শ, ষ, স কোথাও কোথাও হ উচ্চারিত হয়, শ, ষ, স কোথাও ছ-য়ের মতো উচ্চারিত হয় বা স-য়ের মূল উচ্চারণটি বজায় রাখে। আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন উচ্চারণকে যেমন বর্জন করতে পারি না, তেমনি বিভিন্ন উচ্চারণকে অনুসরণ করে বানান নির্ধারণ করতে পারি না। এই কারণে সংস্কৃতের কাঠামোটাকে ভাঙতে চাই না আমি, কোন বর্ণকে বর্জনও করতে চাই না।
সংস্কৃতকে হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নয়, উচ্চারণ ও বানানে বাংলা আর সংস্কৃতে ব্যাপক ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই ব্যবধান কোন পণ্ডিত সমিতি করেনি, প্রাকৃতিক ভাবেই তৈরি হয়েছে। পুরোনো বাড়ী, গাড়ী, (পদাশ্রিত নির্দেশক) টী কোন নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বাড়ি, গাড়ি, টি-তে বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়ার অনেক পরে আমরা নিয়ম করেছি এইসব শব্দে ী হবে না।
আমাদের যে কয়টি বর্ণ আছে, সেগুলো বহাল থাকুক, বিদেশী শব্দের জন্য আমরা কোন বর্ণ তৈরি করবো না, অপ্রয়োজন মনে করে কোন বর্ণকে ত্যাগও করবো না। যে বর্ণগুলো কোন কাজে আসবে না, সেগুলো এমনিতেই ঝরে যাবে। বিদেশী শব্দগুলো বাংলাতে এসে বাংলার মতো হয়ে যাবে। আমি একাডেমি লেখার পক্ষপাতি। একসিডেণ্ট লেখার পক্ষপাতি। নতুন করে অ্যা, তৈরি করতে চাই না।
বাংলায় ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দগুলোকে ইংরেজির মতো উচ্চারণ বহাল রাখতে যদি নতুন নতুন বর্ণ সৃষ্টি করি, তবে আরবী, ফারসী এবং সংস্কৃত শব্দগুলোর উচ্চারণ অবিকৃত রাখার জন্য নতুন নতুন চিহ্ন সৃষ্টি করতে হবে।
সৃষ্টি বা বর্জন কোনটারই দরকার নেই। বিয়ের পর বউটি শ্বশুরালয়ে গিয়ে স্বামীর সংসারের নিয়ম মেনে নিতে হয় প্রাকৃতিকভাবেই, তেমনি স্বামীটি শ্বশুরালয়ে গিয়ে (ঘরজামাই হলে) স্ত্রীর সংসারের নিয়ম মেনে নিতে হয়। প্রাকৃতিক নিয়মকে যুক্তির বেড়াজালে আবদ্ধ না করাই ভালো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *