রোকেয়ার ‘পদ্মরাগ’ : নরনারীর প্রেম, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ও লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি

লেখক :

উপন্যাসটি ১৯২৪ সালে যখন প্রকাশিত হয়-তখন ‘গ্রন্থকর্ত্রী, রোকেয়া ‘নিবেদন’ নামক ভাষ্যে উল্লেখ করেন- ‘প্রায় ২২ বছর পূর্বে এই উপন্যাসখানি লিখিত হইয়াছিল। ইহার পাণ্ডুলিপি তদানীন্তন প্রসিদ্ধ গ্রন্থকার পরলোকগত বাবু জ্ঞানেন্দ্রনাল রায়, এম্-এ, বি-এল্ মহোদয়কে প্রদর্শন করা হইয়াছিল। তিনি তাহা পাঠ করিয়া সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অনেক স্থলে ‘ইবধঁঃরভঁষ’ এবং ‘গড়ংঃ নবধঁঃরভঁষ’ বলিয়া মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেন। তিনি তাহা পরিষ্কার করিয়া পুনরায় লিখিতে উপদেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু নানা কারণে আমি এতদিন তাহা লিখিতে (জবারংব করিতে) পারি নাই। এখন পুনর্লিপি করিতে অনেক স্থল পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও পরিবর্জিত হইয়াছে। কেবল উৎসর্গপত্রখানি পূর্ব্ববৎ অবিকৃত রহিয়াছে।’

আঠাশ পরিচ্ছেদ নিয়ে পদ্মরাগ উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। সাধু ভাষায় লেখা এই উপন্যাসে রোকেয়ার অন্যান্য রচনার মতো মাঝে মাঝে ছন্দোবদ্ধ কবিতাও ব্যবহৃত হয়েছে। ১৩৩৭ সালের শ্রাবণ সংখ্যা ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় শাহাদৎ হোসেন লিখেছেন : ‘পদ্মরাগ’ একখানি উপন্যাস। তবে আজকাল উপন্যাস বলিতে আমরা সাধারণভাবে বুঝি, ইহা যে শ্রেণির উপন্যাস নহে। লেখিকা নিজের ব্যক্তিগত জীবনে যে জিনিসটাকে সবচেয়ে বড় করিয়া দেখিয়াছেন, পদ্মরাগের ভিতর দিয়া তাহাই তিনি সুন্দর করিয়া ফুটাইবার প্রয়াস পাইয়াছেন। তাঁর এ-রচনা মনস্থিত্ব বিশ্লেষণের দিক দিয়া সার্থক হইয়া ফুটে নাই বটে, কিন্তু তিনি যাহা বলিতে চাহিয়াছেন তাহা সুন্দর ও সার্থক হইয়াছে বলিয়াই আমাদের মনে হয়। এই উপন্যাসের কেন্দ্র ‘তারিণী-ভবন’ অনাথাশ্রম (অনাথশ্রম বা বিদ্যাশ্রম যাহাই বলুন)। এবং ইহাকেই অবলম্বন করিয়া এই উপন্যাসের ঘটনা ও নায়ক-নায়িকার চরিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে।’

‘তারিণী-ভবন’ লেখিকার নিছক কল্পনার সৃষ্টি নয়। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আর্দশও এই ‘তারিণী-ভবন’ এবং সেই জন্যই আদর্শ, শিক্ষা ও কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে তিনি যে আলোচনা করেছেন, তা নিখুঁত ও সুন্দর। পদ্মরাগ উপন্যাসটি আত্মজৈবনিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, দীনতারিণী ও পদ্মরাগ প্রধান চরিত্র দুটির মাধ্যমে বেগম রোকেয়া তাঁর জীবন প্রতিভাসই উন্মুক্ত করেছেন।

দীনতারিণী ব্রাহ্ম, কিন্তু তাঁর আশ্রম এবং বিদ্যালয় হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান-সকলেরই এক ইউটোপিয়ান মিলনাস্থান। আশ্রম ও বিদ্যালয়ের কর্মীরা কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ বা খ্রিস্টান। অবাস্তব এক সদ্ভাব তাঁদের মধ্যে বর্তমান। বাস্তবে রোকেয়া যে অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরি করতে পারেননি তাঁর সাখাওয়াত মেমোরিয়ালে, তারিণী ভবন তাতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মনের প্রশস্ত অসা¤প্রদায়িক আদর্শই এতে প্রতিফলিত হয়েছে। পদ্মরাগ উপন্যাসের চতুর্থ পরিচ্ছদে তারিণী-ভবন অধ্যায়ে রোকেয়া উল্লেখ করেছেন অসা¤প্রদায়িক সাম্যের বিষয়টি: ‘বিদ্যালয় বিভাগে ব্রাহ্ম, হিন্দু, খ্রিস্টান শিক্ষয়িত্রী তো ছিলেনই; ক্রমশ মুসলমান ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি হইলে তাহাদের ধর্র্মশিক্ষার জন্য দুই তিনজন মুসলমান শিক্ষয়িত্রীও নিযুক্ত করা হয়। কি সুন্দর সাম্য!- মুসলমান, হিন্দু, ব্রাহ্ম, খ্রিস্টান, সকলে যেন এক মাতৃ-গর্ভজাতা সহোদরার ন্যায় মিলিয়া মিশিয়া কার্য্য করিতেছেন।’

তারিণী ভবনের প্রধান কর্মী চারুবালা, সৌদামিনী, হেলেন, জাফরি, রাফিয়া, সাকিনা, রসিকা, ঊষা প্রমুখ বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী এবং বিভিন্ন পরিবেশ থেকে তাঁরা এসেছেন। তাঁরা সবাই স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতা বা নির্দয়তার শিকার। উপন্যাসের নায়িকা পদ্মরাগ ওরফে সিদ্দিকাও বিবাহের করুণ শিকার। পুরুষ সমাজ যে নিমর্মভাবে নারী নির্যাতন করে থাকে, এই মহিলাদের সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনীতে তা প্রকাশিত। উপন্যাসের তৃতীয় পরিচ্ছেদে দীন-তারিণী অধ্যায়ে লেখিকা উল্লেখ করেছেন এভাবে: ‘যে বিধবার তিন কুলে কেহ নাই, সে কোথায় আশ্রয় পাইবে?- তারিণী-ভবনে। যে বালিকার কেহ নাই, সে কোথায় শিক্ষা লাভ করিবে?- তারিণী বিদ্যালয়ে। যে সধবা স্বামীর পাশবিক অত্যাচারে চূর্ণ-বিচূর্ণ জরাজীর্ণ হইয়া গৃহত্যাগ করিতে বাধ্য হয়, সে কোথায় গমন করিবে?- ঐ তারিণী কর্ম্মালয়ে। যে দরিদ্র দুরারোগ্য রোগে ভুগিতেছে তাহারও আশ্রয়-স্থল ঐ তারিণী-আতুরাশ্রম।’

‘আমি আজীবন নারী জাতির কল্যাণ সাধনের চেষ্টা করিব এবং অবরোধ প্রথার মূলোচ্ছেদ করিব। … আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসার ধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে।’ পদ্মরাগ উপন্যাসের নায়িকা সিদ্দিকার এ উক্তির মধ্যে দিয়ে বেগম রোকেয়া নারীর আত্মমর্যাদা এবং আত্মনির্ভরশীলতার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সমাজের চোখে পরনির্ভশীল, অবহেলিত, নিন্দিত ও পরিত্যক্ত নারীকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তিনি নারীর জীবনকে মানবিক ভিত্তির ওপর স্বাবলম্বী করে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন উপার্জনক্ষম নারীই যথার্থ স্বাধীন।

সুশিক্ষিত, সুচরিত্র, সুদর্শন এবং সিদ্দিকা সম্পর্কে আন্তরিকভাবে আগ্রহী নায়ক ব্যারিস্টার লতিফ আলমাসকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিল সিদ্দিকা নিজেও। কৈশোরে তাদের বাগদানও হয়েছিল। কিন্তু বরপক্ষ কনেপক্ষের সম্পত্তি বিষয়ক বিরোধে অভিভাবকের চাপে আর একটি বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল লতিফ। সেই স্ত্রীর মৃত্যুর পরেও সিদ্দিকাকে কিছুতেই রাজি করানো যায়নি ঘর বাঁধতে। দৃপ্ত স্বরে সিদ্দিকা বলেছিল- ‘তাহারা আমার সম্পত্তি চাহিয়াছে আমাকে চায় নাই। আমরা কি মাটির পুতুল যে পুরুষ যখন ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করিবে আবার যখন ইচ্ছা গ্রহণ করিবে? …আমি যদি উপেক্ষা লাঞ্ছনার কথা ভুলিয়া গিয়া সংসারের নিকট ধরা দেই, তাহা হইলে ভবিষ্যতে এই আদর্শ দেখাইয়া দিদিমা-ঠাকুমাগণ উদীয়মান তেজস্বি^নী রমণীদের বলিবেন আরে রাখো তোমার পণ ও তেজ ঐ দেখ না এতখানি বিড়ম্বনার পরও সিদ্দিকা আবার স্বামী সেবাই জীবনের সার করিয়াছিল। আর পুরুষ সমাজ সগর্বে বলিবেন, নারী যত উচ্চশিক্ষিতা, উন্নতমনা, তেজসি^নী, মহীয়নী, গরিয়সী হউক না কেন- ঘুরিয়া ঘুরিয়া আবার আমাদের পদতলে পড়বেই পড়িবে।’ রোকেয়ার নিজের মনে লুকিয়ে থাকা আকাক্সক্ষার প্রতিমূর্তি হলো সিদ্দিকা।

যৌতুক বিরোধী মনোভাবের প্রতিফলন এই উপন্যাসে আমরা লক্ষ করি, সেইসাথে সমাজ থেকে একদিন যৌতুকের অভিশাপ দূর হয়ে যাবে বলে আশাবাদী হয়ে ওঠেন উপন্যাসিক; এমনি প্রতিভাস ষড়বিংশ পরিচ্ছেদে ‘সন্ধির চেষ্টা’য় উল্লিখিত- ‘সৌ। সিদ্দিকার এই মহান আত্মত্যাগের ফলে মুসলমান পুরুষগণ ভবিষ্যতে কোনো ‘আক্দ্’ করা মেয়েকে উপেক্ষারূপ পদাঘাত করিবার পূর্বে অন্তত একটু ইতস্তত করিবে। আর বিবাহ যেন সম্পত্তি ও অলঙ্কারের জন্য না হয়। কন্যা পণ্যদ্রব্য নহে যে, তাহার সঙ্গে মোটর গাড়ি ও তেতালা বাড়ি ‘ফাউ’ দিতে হইবে। বেশ বোন পদ্মরাগ,-তব এই অশ্রুধারা,/প্লাবিত করিবে ধরা,/সাহারা উর্ব্বরা করি’ ফলাবে সুফল।’

স্ত্রী-শিক্ষা সম্পর্কে রোকেয়া ভেবেছেন সারাজীবন। শিক্ষার মধ্যে দিয়ে নারীর সীমাবদ্ধ জীবনের শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব বলেও তিনি ভেবেছেন, শিক্ষা নারীর সচেতনতা বাড়িয়ে দিতে পারে, সেইসঙ্গে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে নারীর সামাজিক অবস্থান দৃঢ় করা সম্ভব- সেইসাথে নারীর ব্যক্তিত্ব বিকাশে শিক্ষার গুরুত্ব অত্যধিক, সেই তাৎপর্য ও মনোভাবের প্রতিফলন লক্ষ করা যায় উপন্যাসের চতুর্থ পরিচ্ছেদ ‘তারিণী-ভবন’ অধ্যায়ে- ‘ছাত্রীদিগকে দুই পাতা পড়িতে শিখাইয়া বিশ্ব-বিদ্যালয়ের ছাঁচে ঢালিয়া বিলাসিতার পুত্তলিকা গঠিত করা হয় না। বিজ্ঞান, সাহিত্য, ভূগোল, খগোল, ইতিহাস, অঙ্কশাস্ত্র- সবই শিক্ষা দেওয়া হয় কিন্তু শিক্ষার প্রণালী ভিন্ন। মিথ্যা ইতিহাসে কণ্ঠস্থ করাইয়া তাহাদিগকে নিজের দেশ এবং দেশবাসীকে ঘৃণা করিতে শিক্ষা দেওয়া হয় না। নীতিশিক্ষা, ধর্ম্মশিক্ষা, চরিত্র-গঠন প্রভৃতি বিষয়ে অধিক মনোযোগ দান করা হয়। বালিকাদিগকে অতি উচ্চ আর্দশের সুকন্যা, সুগৃহিণী ও সুমাতা হইতে এবং দেশ ও ধর্ম্মকে প্রাণের অধিক ভালোবাসিতে শিক্ষা দেয়া হয়। বিশেষত তাহারা আত্মনির্ভরশীলা হয় এবং ভবিষ্যৎ-জীবনে যেন কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ পিতা, ভ্রাতা বা স্বামী-পুত্রের গলগ্রহ না হয়, এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়।’

রোকেয়ার সময়কালে নারীর শিক্ষার ধরন ও শিক্ষার সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভূমিকা কীরূপ ছিল তা উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। শিক্ষা তখনো নারীর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন পরিধিতে বিস্তৃত ও বিকাশ লাভ করেনি, ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সাংসারিক কর্মকাণ্ডের বিষয়গুলোকে ঘিরে শিক্ষা আবর্তিত হচ্ছিল- এ রকম চিত্র উপন্যাসের ষষ্ঠ পরিচ্ছদে ‘নিতান্ত একাকিনী’ অধ্যায়ে দেখা যায়- ‘সিদ্দিকা কারচুরি ইত্যাদি উচ্চদরের সেলাই জানিতেন বটে কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় কাপড় সেলাই করিতে শিখেন নাই! খেলা-পড়া যাহা শিখিয়াছেন, তাহাও এক্ষেত্রে অর্থকরী নহে। ফল কথা, জমিদার-পরিবারের কন্যাগণ যেমন লেখাপড়া- শুধু ভাষাশিক্ষা এবং নানারূপ সূ² সুচিকার্য, উন বুনান ইত্যাদি শিক্ষা করিয়া থাকেন, সিদ্দিকাও তাহাই জানিতেন। সুতরাং সিদ্দিকা দেখিলেন, তাঁহার কোনো বিদ্যাই পয়সা উপার্জন করিবার উপযোগী যোগ্যতা লাভ করে নাই। অঙ্ক না জানার জন্য লেখাপড়া কাজে আসিল না। শেষে সেলাই করিতে চাহিলেন, তাহাতেও কাটা ছাঁটার হেঙ্গাম। অবশেষে স্থির হইল, তিনি দরিদ্র রোগীদের জামা, পর্দা, চাদরের মুড়ি, বালিশের ওয়াড় প্রভৃতি সেলাই করিবেন।’

অন্যদিকে উপন্যাসের এ অধ্যায়ে লক্ষ করা যায় যে, অফিস কামরায় এসে নারীরা বসছে, তারা অফিসের দৈনন্দিন কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছেন, এমন কি টাইপ করার বিষয়ে নারীরা পুরুষ সহকর্র্মীদের পাশাপাশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন, এমন চিত্র নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে নিঃসন্দেহে- ‘একদিন তারিণীর অফিস কামরায় গিয়া কতিপয় মহিলাকে টাইপ (ঞুঢ়ব) করিতে দেখিয়া সিদ্দিকা ভাবিলেন, এ কার্যটি তো বেশ সহজ তিনি রাফিয়া বেগমের নিকটে গিয়া টাইপ করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় তিনি প্রশ্ন করিলেন- ‘তুমি টাইপ করিতে পার?’ সি। কখনো করি নাই বটে, কিন্তু পারিব; দেখুন না-’।

পদ্মরাগ উপন্যাসের একাধিক জায়গায় অবরোধ বা পর্দাপ্রথাকে সমালোচনা করা হয়। উপন্যাসের একটি চরিত্র রাফিয়াকে দিয়ে বেগম রোকেয়া অবরোধ-প্রথাকে চূর্ণ করার কথা বলেন। অন্য দুজন মহিলা-চরিত্র বানু এবং শাহিদার কথোপকথনে অভিজাত পরিবারের পর্দাকেও ব্যঙ্গ করা হয়, তার মধ্যে দিয়ে বেগম রোকেয়ার পর্দাবিরোধী মনোভাব উচ্চকিত হয়। ‘পদ্মরাগ’ এ নায়িকা সিদ্দিকার মুখ দিয়ে রোকেয়া বলেছেন, ‘আমি আজীবন…নারী জাতির কল্যাণ-সাধনের চেষ্টা করিব এবং অবরোধ-প্রথার মূলোচ্ছেদ করিব।’ রোকেয়া নিজে ছিলেন শরিফ ঘরের মেয়ে। কিন্তু এই ‘শরিফ’দের সম্পর্কে তাঁর ধারণা বা মনোভাব মোটেও প্রসন্ন ছিল না। পদ্মরাগ-এ ঊষার মুখ দিয়ে তিনি বলিয়াছেন : ‘যদি বিধবা মাসী-পিসির সর্বস্ব অপহরণ করিয়া তাহার হাতে কমণ্ডলু দিয়া পথে না বসাইলেন, তবে আর তিনি কিসের বনিয়াদী সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক? তাঁহার হজ, তীর্থ, পুণ্য সবই বৃথা।’

শামসুন্নাহার মাহমুদ লিখেছেন- ‘রোকেয়া ছিলেন অতি পুরাতন এক সম্ভ্রান্ত-শরীফ বংশের সন্তান। মান, মর্যাদা ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে বর্তমান বাংলায় যে সকল পরিবার অগ্রগণ্য তাহার অনেকগুলির সঙ্গেই ছিল রোকেয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। কিন্তু ইহার জন্য তাহাকে কখনো গৌরব অনুভব করিতে দেখি নাই। বরং সম্ভ্রান্ত অর্থে তিনি বুঝিতে অভিশপ্ত। আমার বি.এ. পাশ উপলক্ষে বক্তৃতামুখে তিনি বলিয়াছিলেন- ‘স¤প্রতি আরও কয়েকটি মুসলমান মেয়ে বি.এ. পাস করিয়াছে বটে, কিন্তু নাহারের পাশে একটু বিশেষত্ব আছে, কারণ সে এক অভিশপ্ত অর্থাৎ বাংলাদেশের সম্ভ্রান্তঘরের মেয়ে, যাঁহাদের জন্য লেখাপড়া একেবারে হারাম।’ বংশমর্যাদাকেই আশ্রয় করিয়া অশিক্ষা ও কুসংস্কার পুঞ্জীভূত হইবার বেশি সুযোগ পাইয়াছিল; তাই সম্ভ্রান্ত বংশের নামেই তিনি শিহরিয়া উঠিতেন।’

নারী ও পুরুষের আকর্ষণ মানবজীবনের মৌল বিষয়, কথাসাহিত্যে এ বিষয়টি উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়ে আসছে। নারী পুরুষের প্রতি, পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণ- বয়স ও সমাজের বিভিন্ন পরিধিতে বিভিন্নভাবে জেগে উঠে; এ এক মনস্তাত্তি¡ক জটিল আধার। পদ্মরাগ উপন্যাসে সিদ্দিকার প্রতি লতীফের এক ধরনের আকর্ষণমূলক অনুভূতির বর্ণনা দেখা যায় নবম পরিচ্ছেদের ‘পদার্থপরতা’ অধ্যায়ে- ‘মানুষ সময় সময় কোনো একটী জিনিষের প্রতি কেন যে আকৃষ্ট হয়, তাহা তাহারা নিজেই বুঝিতে পারে না। সেই অজ্ঞাত কারণটা কি? লতীফের পীড়ার সময় তিনি সর্বদা সিদ্দিকাকে আপন শিয়রে উপবিষ্ট দেখিতে ইচ্ছা করিতেন। অন্যান্য ভগিনিগণ নানাপ্রকার গল্প পরিহাস দ্বারা তাঁহার রোগ-যন্ত্রণা লাঘব করিতে চেষ্টা করিতেন, আর সিদ্দিকা কেবলই নীরবে বসিয়া থাকিতেন। লতীফ ঐ মৌনভাবই ভালো বাসিতেন।’

সামাজিক প্রথা নিয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ থেকেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্ব›দ্ব-সংঘাত বিবাহিত জীবনের কোনো কোনো পর্যায়ে হয়ে ওঠে অত্যন্ত সংঘাতময় ও মানসিকভাবে বিব্রতকর, এমনি প্রতিভাস উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদের ‘গৃহ-জীবন’ অধ্যায়ে বেগম রোকেয়া বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন : ‘লতীফ সর্বদা ভাবিতেন “সুখ বুঝি মানব-জগতে নাই।”

নরনারীর প্রেম মনস্তাত্তি¡ক বিভিন্ন অনুভূতিতে প্রকাশ পায়, এর দ্বা›িদ্বক সম্পর্ক ও গভীরতা বিভিন্ন উপন্যাসে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে। রোকেয়ার পদ্মরাগ উপন্যাসে প্রেমের অনুভূতি উদাহরণ ও প্রতীকের ব্যঞ্জনায় দার্শনিক ভাবনায় কখনো কখনো গভীরতা পেয়েছে- এমনি উল্লেখ এই উপন্যাসের চতুর্দশ পরিচ্ছেদের ‘আগুনের সৌন্দর্য’ অধ্যায়ে- ‘হে। ভগিনী! আমি ভাবিয়া দেখিলাম,-না পুড়িলে কিছুই পবিত্র হয় না । ধর্র্মের পথ কণ্টকময়, তাই প্রেমে ক্ষণিক সুখ নাই। যত সুন্দর বস্তু দেখ, সকলের মধ্যেই আগুন আছে। যদি জসেফের সহিত বিচ্ছেদ না হইত তবে আমি এ বিশ্বপ্রেম শিখিতাম না। এখন এ জ্বালা-পোড়া সুন্দর বোধ হয়। জ্বলিতেই সুখ বোধ হয়। জগৎসংসার কেবলই জ্বলিতেছে।’

উপন্যাসের পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদে ‘বিশ্ব-প্রেমিকা’ অধ্যায়ে রোকেয়া প্রেমের অনুভূতি এভাবে চরিত্রের বাক্যালাপে তুলে ধরেছেন- ‘ল। তর্ক করিতে ইচ্ছুক ছিলে বটে, কিন্তু পারিলে না! না, হৃদয় সীমাবদ্ধ নহে। উহা অনলের মত, যত বাতি জ্বালাও-সমভাবে জ্বলিবে। যত পতঙ্গ পোড়াইতে পার-পুড়িবে। সি। (স্মিতমুখে) দগ্ধ পতঙ্গের প্রতি দয়া হয় বটে। কিন্তু ইহাওবলি, পতঙ্গের কি কোনো দোষ নাই? ল। দোষ আছে বই কি! সর্Ÿাপেক্ষা প্রধান দোষ এই যে, সে সৌন্দর্য-ভিখারী প্রেমের ভিখারী। সুতরাং ভিক্ষুকের লাঞ্ছনাই তাহার উপযুক্ত প্রাপ্য। সেইজন্য সে প্রাণদানে প্রায়শ্চিত্ত করে।’

পদ্মরাগ একটি আদর্শকে ধারণ করে, আটাশ পরিচ্ছেদের উপন্যাসটির গঠনে অনেক সময়ে বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার কথা মনে আসে। শিরোনাম, সংলাপ কিংবা চরিত্রের পরিচয় দান এসবে একটি বঙ্কিমপ্রভাব অনুভব করা যায়। কারণ, রোকেয়ার সময়টা নিশ্চিত অর্থেই ঊনবিংশ শতাব্দী দ্বারা প্রভাবিত। নায়ক চরিত্র হিসেবে লতীফ এক সময় সিদ্দিকাকে সমাজ-সংস্কারের বশে অবহেলা করে। রোকেয়া অত্যন্ত তীব্রতার সাথে এ অবহেলার কথা বলেন।

তারিণী-ভবনের সেবা এবং নারী জাতির কল্যাণ সাধনে ব্রতী হওয়া- এই উদ্দেশ্যেই সিদ্দিকা নির্মিত হলেও, লেখক চরিত্রটির শিল্পীত উপস্থাপনে দারুণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছন। পদ্মরাগের শুরুতেই যুবক, তারপর নাটকীয় ঢংয়ে তিনজন ব্রাহ্মণ উপস্থিতি, দীন-তারিণী, সিদ্দিকা এবং তার পাশাপাশি সৌদামনী, রাবিয়া, সকিনা এদের উপস্থিতি ও মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি মিলে পদ্মরাগ নামে অভিষিক্ত নারীর কল্পকথাই উদ্দেশ্য-নির্ভর করে বয়ান করেন লেখক।

পদ্মরাগ উন্যাসের সপ্তম পরিচ্ছেদে ‘রোগী’ নামের অধ্যায়ের অংশ উল্লেখ করা যায়, যাতে লেখকের বর্ণনাভঙ্গি সাবলীল ও চিত্রময়তা নিয়ে শিলিপ্ত হয়েছে- ‘শট্কাট’ পথ আসিতে আসিতে একটা ঝোপের নিকট মানুষের মতো কি একটা জিনিষের উপর তাঁহাদের দৃষ্টি পড়িল। তাঁহারা কিঞ্চিৎ ইতস্তত করিয়া ঝোপের মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন,-এ কি। সত্যই একজন মানুষ রুধিরাক্ত কলেবরে পড়িয়া আছে। ঝোপের ভিতর জ্যোৎ¯œালোক স্পষ্ট পৌঁছিতে পারে নাই, তাই কিছু অন্ধকার ছিল। তাঁহাদের শরীর কণ্টকিত হইল! তাঁহারা ভাবিতে লাগিলেন, কি করা উচিত? ঊষা নাড়ী পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন, মানুষটি এখনো জীবিত আছে- যতœ করিলে বাঁচিতে পারে। কিন্তু যতœ অতি শিগগির হওয়া আবশ্যক।’

চতুর্থবিংশ পরিচ্ছেদে ‘সুবর্ণরেখা’ নামক অধ্যায়ে ‘সুবর্ণরেখা’ নামের নদীর স্বতঃস্ফূর্ত বর্ণনা লক্ষ করা যায়- ‘সুবর্ণরেখা এ সময় বর্ষাকালের মতো খরস্রোতা না হইলেও তাহার স্রোত এখনো যথেষ্ট বেগবতী। নদী গভীর নহে- সমস্ত নদীর জল ‘হরে দরে হাঁটু জল’ হইবে, কিন্তু স্রোতের বেগ কি ভীষণ! এ নদী পাহাদের ওপর দিয়া বহিয়া চলিয়াছে। পাহাড় উচ্চ নহে, বড় বড় শিলাখণ্ড বিশেষ। নদীতল কর্দ্দম ও উপল খণ্ডে পরিপূর্ণ। নদী প্রশস্ত নহে। এই অল্পপরিসর নদীটুকু কেহ পদব্রজে পার হইতে পারে না বলিয়া ইহার উপর সেতু নির্মিত হইয়াছে। ট্রেনও এই পুলের উপর দিয়া চলে।’

এই উপন্যাসের অনেক পরিচ্ছেদে কবিতা ব্যবহৃত হয়েছে, কোনো কোনো কবিতার অংশ বেশ বড়, কোনো অংশ ছোট, এভাবে উপন্যাসে ভিন্ন ব্যঞ্জনা লক্ষ করা যায়। আধুনিক উপন্যাসেও কবিতা ব্যবহৃত হয় কিন্তু প্রায় শত বছর আগে লেখা রোকেয়ার উপন্যাসে এ ধরনের কবিতার ব্যবহার- অভিনব এবং নীরিক্ষাপ্রবণ বলেই চিহ্নিত করা যায়, যা উপন্যাসে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। কবিতার এই ব্যবহারে বক্তব্যের গভীরতা ও ব্যঞ্জনা বেড়েছে বৈ কমেনি।

তারিণী কর্মালয়ের সাহায্যে মহিলারা অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছে। নিজের জীবিকা এখানে নিজেই অর্জন করা যায়। এখানে শিক্ষিকা, টাইপিস্ট বা সেবিকা হওয়ার পথ খোলা। ছুটিছাটায় আশ্রম বাসিনীরা কলকাতার বাইরে স্বাস্থ্যকর স্থানে ভ্রমণ করে, প্রকৃতির শোভা প্রাণভরে উপভোগ করে। অবরোধ নেই, পর্দার কড়াকড়ি নেই, স্বচ্ছন্দ স্বাধীন চলাফেরা।

তারিণী ভবন সংসারের চিত্র নয়, সংসার থেকে পালানো মেয়েদের ছবি। চরিত্রদের স্মৃতিচারণায় যে সংসার চিত্র পাওয়া যায় তার মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় আচার বিচার বা রান্না খাওয়ার কথা নেই। তার বদলে রয়েছে মানুষের সম্পর্কের জটিলতার কথা। তারিণী ভবনে বিবাহিত জীবনে ‘ফেল’ করা মেয়েরা আশ্রয় পেয়ে বেঁচে গেছে। ধর্মীয় বিধিনিষেধহীন মুক্ত পরিবেশে স্বর্গতুল্য শান্তি অনুভব করেছে।

আয়েশা সিদ্দীকা নিঃসন্দেহে নতুন নারী কিন্তু তার সংসারত্যাগী সিদ্ধান্ত তৎকালীন সমাজে ‘নব নারী’র আর্দশের সীমা ছাড়িয়ে যায়। ভদ্রমহিলাদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তৈরি ভিন্ন এক চরিত্র। রচনাটির ভাষা ও উপস্থাপনা উনিশ শতকীয় উপন্যাসের মতন। কিন্তু বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। পুরনো রীতির সাধুভাষা এবং সংলাপ, অগঠিত চরিত্র নিয়েও পদ্মরাগ নতুন কথা বলেছে। পদ্মরাগ আদর্শিক উপন্যাস হলেও তা এক নতুন জীবনের উদ্ভাস ও সজীব।