বাঙালি মুসলিমের নাম

লেখক :
আলোচনাটা নাম নিয়ে, তবু শিরোনামায় বাঙালি মুসলিমের নাম রাখার বিশেষ কারণ আছে৷ কারও প্রতি বিদ্বেষ প্রসূত নয়, বরং নাম রাখার ধরন নিয়ে কথা বলছি৷
মানুষের জন্য নামটা গুরুত্বপূর্ণ, অপরিহার্য৷ ডিএনএ বা ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে যা সম্ভব নয় তা নাম দিয়ে সম্ভব৷ নাম না থাকলে সনাক্তিকরণ সম্ভব হবে না৷
রামায়ণ, মহাভারতসহ প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থসমূহে নাম একশব্দ বিশিষ্ট, কোন প্রকার পারিবারিক খেতাব ছিল না, ধর্মীয় খেতাবও নয়৷ রামকে কখনো শ্রী রাম লেখা হয় নি, রাবণকেও নয়৷
কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত পঁচিশ (চব্বিশ?) জন নবী ও রাসুলের নামও একক শব্দে৷ এমনকি নবী মুহম্মদের নামও মুহম্মদই, আগে পাছে অন্য কোন শব্দ নেই৷
সমগ্র পৃথিবীতে একক শব্দে নাম রাখার নিয়মই জনপ্রিয়৷ কারও একাধিক নাম থাকে তবে অফিসিয়াল নাম থাকে একটাই৷
বাঙালি হিন্দুও নাম রাখে একশব্দে, সাথে পারিবারিক নাম ব্যবহার করে৷ রবীন্দ্রনাথ, তিনটি শব্দ মিলে একশব্দ হয়েছে৷
সারা বিশ্বের নাম রাখার নিয়মকে তোয়াক্কা করে না বাঙালি মুসলিম৷ আজকাল আবার কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নামের আয়তন অনেক বড়, কাগজের একপৃষ্ঠায় ধরে না৷
এ নিয়মটা এলো কোথা হতে?
এটাও মোঘল দরবার থেকে শুরু হয়েছে৷ যদি পৃথিবীর বাদশার নিরানব্বই নাম থাকতে পারে তাহলে একটা রাজ্যের বাদশার অন্তত নয়টা নাম তো থাকা চাই৷
হুমায়ূনের মৃত্যুর পর নাবালক আকবর সিংহাসনে বসলেন, আকবর হয়ে গেলেন জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর শাহ বাদশাহ৷ সম্ভবত এর থেকে শুরু৷
এরপর নিয়মটা ইবোলার মতো ছড়িয়ে পড়লো সারা ভারতে, যার নাম যত বড় সে তত বড় বাদশাহ৷ এরপর রাজ্য গিয়েছে, কিন্তু নাম রয়ে গেছে৷
আরেকটা কারণও আছে, অজ্ঞতা৷ অর্থ না বুঝে নকল প্রবণতাও আছে৷ শ্রদ্ধা ভরে নিজের ছেলের নাম রাখলেন মোঃ অাবু হানিফা ৷ হুজুর(!) ডাকলেন, নামের বরকত জাহির করতে চাইলেন৷ তিনি বললেন, মাশাআল্লাহ, সুবহানআল্লাহ, আপনার ছেলে তো বরকতময়, একজনই দুই মহাপুরুষের নাম ধারণ করেছে৷ যদি খাবার আর হাদিয়ার পরিমাণ আশাব্যঞ্জক হয়, তাহলে বরকতে ফিরিস্তি রহমতে গিয়ে শেষ হবে৷ আপনি তো জানেন না, তিনিও বলেননি, আপনার ছেলের নাম একটা অর্থহীন বাক্য হয়ে গেছে৷
মুহম্মদ রাসুল সা.-এর নাম, তিনি কিন্তু কখনো বলেননি আমার নামে নাম রাখো, বরকত হবে৷ তাহলে সমগ্র আরব ভূখণ্ড মুহম্মদময় হয়ে যেত৷ হুজুর কিন্তু বলছেন৷
আবু হানিফা কে? সবাই জানেন তিনি একজন প্রসিদ্ধ ইমাম, একটা মাযহাবের প্রবর্তক৷ তার প্রকৃত নাম কি জানেন? নুমান, তাঁর পিতার নাম সাবিত, আরবীয় নিয়মে নুমান বিন সাবিত৷ আবু হানিফা কেন হলো? কারণ তিনি হানিফার বাপ ছিলেন৷ আবু হানিফা মানে হানিফার বাপ৷ হানিফা কে? নঈমের কন্যা৷ আমরা যেমন কাউকে বড় সন্তানের নামে অমুকের বাপ বলি, আবু হানিফাও তেমনি৷
আপনি যদি পুরুষ হন, আপনার নাম হানিফা হতে পারে না৷ এটা স্ত্রীবাচক শব্দ, হানিফের স্ত্রী হানিফা৷
নামের আগে মুহম্মদ কেন ব্যবহার করেন? এটা শ্রী শব্দের বিকল্প৷ মুহম্মদ যেমন নামকে প্রসংশিত করে না, শ্রীও নামের শ্রী বৃদ্ধি করে না৷
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নামের আগে শ্রী লেখেন নি৷ কোথাও কোথাও শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখা পাওয়া যায়, তবে এই শ্রী তিনি নিজে লিখেছেন কিনা প্রমাণ নেই৷ শ্রীর আমদানী বিংশশতাব্দির গোড়ার দিকে৷
সব হিন্দু যখন শ্রী হয়ে গেলেন, দলীল দস্তাবেজে মুসলমানকেও শ্রী বানাতে লাগলেন৷ ঠেকায় পড়ে মুসলমানও মুহম্মদ আমদানী করলেন৷
আরবীয়রা অবাক হয়ে জানতে চায়, কেফ কুল্লু বাঙ্গালি মুহম্মদ? (সব বাঙালি মুহম্মদ হয় কী করে?)