ক-বর্গে আনুনাসিক ঙ

লেখক :

সংস্কৃত বা তৎসম শব্দে ক-বর্গের পূর্বে আনুনাসিক বর্ণ এলে তা ঙ-তে রূপান্তরিত হয়৷ সংখ্যা (সংস্কৃত সম্ + √খ্যা + অ + আ) শব্দটিও তৎসম, তবু খ্যা ধাতুর খ বর্ণের পূর্বে আনুনাসিক ম্ ং হলো কেন?

প্রসঙ্গটি জটিল। অতি সংক্ষেপে কয়েকটি কথা বলি। —

১। পুরনো (১৯-এর শতকের প্রথমার্ধের) ছাপায় ‘সঙ্খ্যা’ পেয়েছি, পরে ং লেখার রীতি চালু হয়।

২। ঙ্‌-এর বদলে ং লেখা (এবং, বিপরীতক্রমে, ং-এর জন্য ক-বর্গের শেষ অনুনাসিক, অর্থাৎ ঙ্‌ উচ্চারণ করা ও লেখা) মনে হয় মাগধী প্রাকৃত-র প্রাচীন প্রথা। ং-এর উচ্চারণ সংস্কৃততে যা ছিল, তা বজায় নেই। অন্যত্র এটা পরবর্তী বর্ণের সংশ্লিষ্ট অনুনাসিক ধ্বনি হয়েছে।

৩। পূর্বভারতে কেবল ক-বর্গের জন্য অনুনাসিক ধ্বনি (ঙ্‌) স্বীকৃত; অন্য বর্গের জন্য সংশ্লিষ্ট অনুনাসিক (যথাক্রমে ঞ্‌,ণ,ন্‌,ম্‌)-এর সঙ্গে যুক্তাক্ষর করা হয়। আবার অর্ধস্বর, বা শিস্‌-ধ্বনিগুলি(শ্‌-স্‌-ষ্‌)-র জন্য এদের আগে অনুস্বারগুলির ক্ষেত্রে পণ্ডিতেরা কোন নিদান দিয়েছিলেন কিনা জানা নেই। তবু এসব ক্ষেত্রে অনুস্বারকে (ঙ্‌) উচ্চারণ করা মান্য রীতি, যা অন্যত্র বিভ্রান্তিকর মনে হবে।

৩ক। দৃষ্টান্ত দিই: নাগরী বর্ণমালায় একটি শব্দ वंश, একে আধুনিক রোমকে বদলে vaṃśa করা হয়। উচ্চারণে পার্থক্য হবে না। এখানে প্রথম অক্ষর অর্ধস্বর, পূর্বভারতে ৭০০-৭৫০-তেই বর্গীয় উচ্চারণ পাচ্ছে, লেখাতে ও অবয়বে একরম হয়ে যাচ্ছে (সঙ্গের হ্রস্ব ‘আ’-এর কথা আর বলছি না)। এমন কি বানানে /বংশ/ লিখে উচ্চারণ /বঙ্শ/ করা হচ্ছিল, এমনও প্রমাণ পাওয়া যায়।

(১) এখনকার গোয়ালিয়র এলাকায় একটা প্রত্নলিপি পাওয়া গেল, ১০ম শতকের। তাতে একটা শব্দ পড়া হলো বৃহদ্বঙ্গ (=বৃহৎ(দ্)বঙ্গ)। রায় দীনেশচন্দ্র সেন বাহাদুরের দেশপ্রেম উদ্বেলিত হয়ে উঠল, বঙ্গকে যতটা পারা বৃহৎ করবার আশায় দুখণ্ডে বই নামিয়ে দিলেন_’বৃহদ্বঙ্গ’। বিপুল বিক্রয়। এখনও। (পাঠ তখনই শোধরানো হয়েছিল_বঙ্ শ, মানে ‘বংশ’। বড় বা নামী বংশ।)

(২) একই সমস্যা হয়েছে আহমদ হাসান দানীর হাতে ময়নামতীতে পাওয়া লডহচন্দ্রের প্রত্নলেখতে। অন্তত চার জায়গায় বঙ্ শকে বঙ্গ (বঙ্গ) করেছেন। অর্থ কিম্ভূত হয়েছে।

(৩) আমরা তালব্য শ, দন্ত্য স, মূর্ধণ্য ষ, এদের উচ্চারণ-স্থান মেনে নাম বলি। সবার স্বরান্ত উচ্চারণ ‘শ’। যুক্তাক্ষরে উচ্চারণ কেমন হবে আলোচনা করে থাকি, তা মনে হয় নিরর্থক। ওপরের দৃষ্টান্তে ‘শ’-এর তালব্য ধ্বনি হলে ং-ও তালব্য হয়, ঞ্ উচ্চারণ হয় বঞ্ শ (বঞ্চনা,বাঞ্ছা,গঞ্জ,ঝঞ্ঝাট, এদের মত), করি না। আমদের সংসার, আদতে সঙ্ সার, উত্তরাপথে সন্সার, দক্ষিণে সম্ সার। এই রকম।