বিকেলের মৃত্যু : শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সংক্ষেপে :

ভীষণ ব্যস্ত বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা লীনা ভট্টাচার্য। টাকার জন্য নয়, অনেকটা সময় কাটাতেই সে চাকুরি নিল একটা কোম্পানিতে। কিন্তু শুরু থেকেই তার মেজাজ খারাপ ববি রায়ের উপর। আসলে ও যে ববি রায়েরই সেক্রেটারি। আর এই ববি রায় হল ভীষণই নারীবিদ্বেষী এক পুরুষ। এই যখন অবস্থা তখন ববি লীনাকে কিছু পাসওয়ার্ড আর একটা অত্যাধুনিক গাড়ি দিয়ে আচমকাই নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, এটা বলে যে তার নাকি প্রাণনাশের সম্ভাবনা আছে।

কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না লীনা। দীর্ঘদিনের বন্ধু দোলনকে নিয়ে সে লেগে গেল সমস্যা সমাধানে। অচিরেই ববির কম্পিউটার থেকে সে আবিস্কার করল নীল মন্জিল নামক এক বাড়ির ঠিকানা যা ববির নির্দেশে ডিলিটও করল সে। এদবকে নিজেকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ইন্দ্রজিৎ ঢুকে পড়ল ববির অফিসে আর সেদিন বিকেলেই তার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল। লীনা বুঝতে পারল এক জটিল জালে আটকা পড়েছে সে।

অন্যদিকে ববি যখন মুম্বাই হয়ে প্যারিসে চলে যেতে চাচ্ছিল তখনই সে বাঁধার সম্মুখীন হলো ভাড়াটে খুনিদের দ্বারা। কেন? কিসের এত পাসওয়ার্ড, এত গোপণীয়তা? কেন ববিকে হত্যা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র? কি আছে ঐ নীল মঞ্জিলে? তাহলে কি বিজ্ঞানী রবীশ ঘোষের দেওয়া গবেষণাই এর জন্য দায়ী?

পাঠ প্রতিক্রিয়া :

মোটামুটি বলা যেতে পারে বইটাকে। থ্রিলার হয়েও কেন যেন থ্রিলার হয়ে ওঠে নি বইটা। ভালো লাগার যে বিষয়টা তা হলো আজ থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে যে বাংলা ভাষায় এমন মৌলিক একটা বই লেখা হয়েছে তা আবিষ্কার করা। বইটাতে একটা গতি আছে যাতে বইটা শুরু করলে আপনি শেষ করতে বাধ্য। প্রথমেই বিচিত্র স্বভাবের এক নায়ক, তারপর আজব কিছু সংকেত, গাড়ি আর মানুষ, তারপর হঠাৎ করে একটা রহস্যের জগতে হারিয়ে যাওয়া। আবার কি হবে কি হবে ভাবতে ভাবতে আপনি যখন ভাবতে শুরু করবেন এসবের কারণটা কি তখনই লেখক আপনাকে রহস্যের প্রেক্ষাপট বলে নিবেন যাতে আপনি আবার সামনে কি হয় সেটা জানতেই আগ্রহী হবেন। এভাবে বইটা গতির সাথে সাথে ধীরে ধীরে আপনার সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিয়ে একদম শেষে নিয়ে যাবে সেই অন্তিম প্রশ্নের উত্তরে বা নীল মঞ্জিলের রহস্য উদঘাটনে। আবার এই থ্রিলিং ব্যাপারটার সাথে সাথে বিভিন্ন হাস্যকৌতুকগুলো মাঝে মাঝে আপনাকে ভিন্ন একটা স্বাদও দেবে।

তবে বেশ কয়েকটা বিষয় আছে যা বইটিতে আমার ভালো লাগে নি। তার মধ্যে প্রথমেই আসবে নায়ককে সুপারম্যান করে তোলা। একে তো নায়ককে লেখক দেখিয়েছেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে তার উপর নায়ক আবার জুডো ব্ল্যাকবেল্ট। তাইতো নায়ক খালিহাতেই দুই ভাড়াটে খুনিকে ঘায়েল করতে পারে, বন্দুক থাকাসত্ত্বেও কাবু করতে পারে আরেকদলকে বা আগেররাতে সারারাত নির্যাতনের শিকার হয়েও পরের দিনেই খালি হাতে ধরাশায়ী করতে পারে সাব মেশিনগান ওয়ালা বক্সিং চ্যাম্পিয়নকে। আবার অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েও এক মিনিটেই ফিরে পেতে পারে চেতনা যাতে লীনাকে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে জীবন বাঁচাতে পারে।

আবার ববি-লীনার প্রেমটাও বেশ খাপছাড়া মনে হয়েছে। শুরু থেকেই ববিকে লেখক কাজের প্রতি ভীষণ সিরিয়াস, আনমনা আর নারীবিদ্বেষী হিসেবে দেখালেও কোনো এক অজানা কারণে দেখা যায় শেষদিকে ববি লীনার প্রেমে পড়ে। অন্যদিকে লীনা দীর্ঘদিন দোলনের সাথে সম্পর্কে থাকলেও শেষে দেখা যায় লীনাও প্রেমে পড়ছে ববির আর দোলনের সাথে সম্পর্কটাকে লেখক এভাবে ‘একবছর যাবৎ প্রেমের চেষ্টা করেও হচ্ছে না’ বলে ব্যাখ্যা করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয়েছে।

আবার কাহিনীও লেখক কিছুটা অযথাই পেঁচিয়েছেন বলে মনে হয়েছে আর শেষদিকে ভাড়াটে খুনি জন আর বক্সারের নিজেরা নিজেরা মারা পড়ার দৃশ্যটা তো কিছুটা হাস্যকর মনে হয়েছে।

অর্থাৎ আমার যেটা মনে হয়েছে যারা আমার মতো থ্রিলার তেমন একটা পড়ে নি তাদের ক্ষেত্রে কাহিনীটা বেশ ভালো বলে মনে হলেও যারা থ্রিলার ভক্ত তাদের কাছে বইটা তেমন আহামরি কিছু মনে হবে না।