অমিতাভ ঘোষের গান আইল্যাণ্ড নিয়ে কয়েক কথা

লেখক :
বই – গান আইল্যাণ্ড (Gun Island)
লেখক – অমিতাভ ঘোষ (Amitav Ghosh)
প্রকাশক – পেঙ্গুইন হ্যামিশ হ্যামিল্টন (Penguin Hamish Hamilton)
মূদ্রিত মূল্য – ৬৯৯/-
অমিতাভ ঘোষের নবতম উপন্যাস ‘গান আইল্যাণ্ড’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালের জুন মাসে। এর আগে ২০১৬ সালে ক্লাইমেট ক্রাইসিস বা পরিবেশ দূষণের সংকটের ওপর ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বহুল প্রচারিত ও বিখ্যাত নন ফিকসন ‘দি গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’। ‘গান আইল্যাণ্ড’ – এ কিন্তু সেই নন ফিকসনের বেশ কিছু বিষয়কে নিয়ে এসেছেন তাঁর এই নবতম ফিকসনে।
অমিতাভ ঘোষের ফিকসন লেখার বিশেষত্ত্বই হল, ফিকসনের মধ্যেও অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আর বিস্তীর্ণ সময়। আইবিস ট্রিলজি যার সার্থক উদাহরণ। যে তিনটি উপন্যাসে ফিকসনের থেকেও বড় হয়ে উঠেছিল ঐতিহাসিক গবেষণার উৎকৃষ্টতা। ‘গান আইল্যাণ্ডে’ও ঠিক একই ভাবে ফিকসনের থেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বর্তমান সময়ের দুটি বড় বিশ্ব সংকট – প্রথমত, পরিবেশ দূষণের ভয়ংকর ফলশ্রুতি; আর দ্বিতীয়ত, উদ্বাস্তু ও অভিবাসী সমস্যা। আর গল্পের কলাকুশলীরা ঘুরেছে সুন্দরবন থেকে ভেনিস অবধি। কিন্তু ঘোষের মত লেখকরা জানেন কিভাবে বিশ্বের এই চরম সংকটকে গল্পের আকারে পাঠকে শোনাতে হয়। তাই তিনি খুব সজ্ঞানে এই উপন্যাসে নিয়ে আসেন মিথ আর লোকগাথার অনবদ্য সংমিশ্রণ।
বন্দুকী সওদাগর, মনসা দেবী, সুন্দরবনের লোকগাথা আর তার সঙ্গে আধুনিক জীবনযাত্রার কথা – সব মিলে প্রথম থেকেই পাঠকে আটকে রাখেন অমিতাভ। কাহিনীর কথক ও নায়ক দীননাথ – যে দিন নামেই বেশি পরিচিত বন্ধুমহলে, ব্রুকলিন-এ দুষ্প্রাপ্য বই বিক্রেতা নিজের শহর কলকাতায় আসে। আর কলকাতায় আসার পর ঘটনাক্রমে বন্দুকী সওদাগরের গল্প শুনে দীননাথ বাধ্য হয় সুন্দরবনে যেতে। আর তার জীবনে প্রবেশ করে বন্দুকী সওদাগর।
লেখকের নিজের ভাষায়, “The Gun Merchant entered my life not in Brooklyn, where I live and work, but in the city where I was born and raised – Calcutta (or Kolkata, as it is now formally known). সেখানে পুরোনো ইটের মন্দিরে সাংকেতিক কিছু লিপিতে আর টেরাকোটার কাজে বন্দুকী সওদাগর, মনসা দেবী, বন্দুকী সওদাগরের জীবনে ঘটে চলা ঘটনার লেখা দেখে এক অদ্ভুত উদ্দীপনায় আপ্লুত হয় দীননাথ।
দীননাথ একসময় লৌকিক কাব্য মনসামঙ্গল নিয়ে গবেষণা করেছেন। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে মনসাদেবীর অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে বন্দুকী সওদাগর বেরিয়ে পড়ে বাণিজ্যে। তারপর ভারত মহাসাগরে পর্তুগীজ জলদস্যুদের কবলে পড়লে তাকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। ইলিয়াস নামে এক বনিক কিনে নেয় তাকে। তারপর নানা দ্বীপে বাণিজ্যে ছড়িয়ে পড়ে তারা। কিন্তু প্রত্যেক দ্বীপেই ভীষণ রকমের সব দুর্ভোগের সম্মুখীন হয় তারা। শেষ পর্যন্ত ভেনিসে এসে মনসাদেবীর নজরে পড়ে যায় তারা। তারপর ফিরে আসে দেশে। দেশে ফিরে সুন্দরবনে তৈরী করে এই মন্দির।
কিন্তু বন্দুকী সওদাগরের গল্প কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। তা চলছে পাঁচালি গানে আর কথায়। সব মিলিয়ে এ যেন এক আধুনিক মনসামঙ্গল। এই সব ভাবনা চিন্তার মাঝেই মন্দিরে আকস্মিক এক ঘটনা ঘটে যায়। সুন্দরবনে দীননাথের সঙ্গী তরুণ এবং মাত্রাতিরিক্ত স্মার্ট টিপু সহসা সর্প দংশণে জীবন সংকটে পড়ে। প্রাণরক্ষা পেলেও টিপু পরবর্তী সময়ে তার অবচেতনে সামঞ্জস্যহীন কিছু বিষয় দেখতে পায় যেখানে প্রাচীন সময় ও বর্তমান সময়, মানব ও অমানব, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে অদৃশ্য কোনো সংযোগচিহ্ণ গড়ে ওঠে। আর এ রহস্যের উন্মোচন হয় একদম চূড়ান্ত পর্যায়। কাহিনীর মাঝামাঝি পর্যায়ে অমিতাভ ক্লাইমেট ক্রাইসিসের বিষয়গুলোকে অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে গল্পের মূলস্রোতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আর বিশদে এই বিষয়কে উপন্যাসে সংযুক্তিকরণের কারণ হল – অমিতাভ নিজে জলবায়ু সংকটের বিষময় ফলশ্রুতিতে বিশ্ব কিভাবে জর্জরিত হচ্ছে তা খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। উষ্ণায়নের কারণে কিভাবে সমুদ্রস্রোত উষ্ণ হয়ে বিষাক্ত সাপ বিভিন্ন সমুদ্রসৈকতে ছড়িয়ে পড়ছে বা প্রচণ্ড গরমে ইউরোপের বিষাক্ত মাকড়সা কিভাবে এক জায়গা থেকে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তার কথা বলেছেন লেখক গল্পের মধ্যেই। বিশ্ব উষ্ণায়নের বিষবাষ্পে কিভাবে ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায় তার বর্ণনাও আছে এই উপন্যাসে। এছাড়াও পরিবেশ দূষণের কারণে তটভূমিতে তিমি প্রাণসংকট, বিধ্বংসী ঝঞ্ঝা, পাখিমৃত্যুর কথাও আছে উপন্যাসে। মিথ, ম্যাজিক, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, ব্যুৎপত্তি – সমস্ত কিছুকেই স্পর্শ করেছে এই উপন্যাস।
আরেকটি যে বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ অধিকার করে আছে এ উপন্যাসে তা হল – অভিবাসী সমস্যা, হিউম্যান ট্রাফিকিং বা মানুষ পাচার। সেখানে ইন্টারনেট কানেকশনওয়ালা একটা স্মার্টফোন যে সোস্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যোগাযোগ করে কিভাবে পাসপোর্ট, ভিসা ছাড়া অজস্র অভিবাসী সারা পৃথিবী জুড়ে যাতায়াত করছে তা দীননাথকে প্রথম আলাপেই বুঝিয়ে ফেলে টিপু। টিপু ও তার সঙ্গীরা কিভাবে বেআইনি ভাবে জলপথে পাড়ি দিয়েছে ইউরোপের দিকে তার ছবিও এঁকেছেন লেখক তার কলমে। এদিকে ইটালি, ফ্রান্স বেআইনি অভিবাসীদের প্রবেশ করতে দেবে না।
এককথায় বলতে গেলে এ উপন্যাস বহুমাত্রিক। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসী সমস্যার মত বিশ্ব রাজনীতি তোলপাড় করা বিষয়ের সঙ্গে লেখক সম্পৃক্ত করেছেন আধুনিক চাঁদ সওদাগরের গল্প। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রথম কোনো ভারতীয়র ফিকসন। এর সঙ্গে রয়েছে অমিতাভ ঘোষের পরিচিত সাবলীল ভাষা।
বাংলায় যাঁরা উপন্যাস লিখছেন তাঁদের বলব অনুগ্রহ করে এই বইটি পড়ুন। আধুনিক উপন্যাস কিভাবে লিখতে হয় সে সম্পর্কে একটু হলেও ধারনা পাবেন। বহু আন্তর্জাতিক বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে ভালো ফিকসন বাংলায় লেখার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। যদিও বাংলা ভাষার ঔপন্যাসিকদের সেই পথের দিকে দৃকপাত করতে আমি দেখিনা।
তবে এ উপন্যাসের কিছু দুর্বল দিকও আছে। বিশ্বের আধুনিক সংকটের বেশ কিছু দিক নিপুঁনভাবে চিত্রায়িত করলেও উপন্যাসের প্লট যথেষ্ট দুর্বল বলে মনে হয়েছে। উপরন্তু কোনো চরিত্রকেই লেখক সঠিকভাবে গঠন করতে পারেননি। এমনকি কেন্দ্রীয় চরিত্র দীননাথ দত্তকেও।
অমিতাভের ২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘হাংরি টাইড’ উপন্যাসের পিয়ালি রায় বা পিয়া এ গল্পে এক চরিত্রে আছেন। তবে ‘গান আইল্যাণ্ড’ কিন্তু ‘হাংরি টাইড’ এর সিকুয়্যেল নয়। উপন্যাসে কিছু জায়গায় ঘোষ স্যুররিয়েলিজমের বাতাবরণ তৈরী করতে চেয়েছেন। তবে অনেকক্ষেত্রেই তা সার্থক হয়নি। তবে সব মিলিয়ে সিরিয়াস পাঠকের এই বই পড়তে যথেষ্ট ভালো লাগবে বলেই মনে হয়।