বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’

“শীতের বৈকাল। বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ঘন ছায়া নামিয়াছে, দূরে বনশ্রেণীর মাথায় মাথায় অল্প অল্প কুয়াশা জমিয়াছে। রেল-লাইনের দু-ধারে মটর-ক্ষেত, শীতল সান্ধ্য-বাতাসে তাজা মটরশাকের স্নিগ্ধ সুগন্ধে কেমন মনে হইল যে-জীবন আরম্ভ করিতে যাইতেছি তাহা বড় নির্জন হইবে, এই শীতের সন্ধ্যা যেমন নির্জন এই উদাস প্রান্তর আর ওই দূরের নীলবর্ণ বনশ্রেণী, তেমনি।”

কোলকাতা ছেড়ে পূর্ণিয়া জেলার ২০ থেকে ৩০ হাজার বিঘা জমির জঙ্গল-মহালের ম্যানেজার হিসেবে প্রথম যেদিন ছোট্ট রেল স্টেসনে নামল সত্যচরণ তখন তাঁর এই অনুভূতি বয়ে যায়। এরপর তারায় তারায় বনরাজির ভেতর একনাগাড়ে ৬টি বছর কেটে যায় কথকের সেখানে ম্যানেজার হিসেবে। তারপর কোলকাতা ফিরে আসা শেষে। আমার কাছে সত্যচরণ না বিভূতিভূষণকেই প্রতি পৃষ্ঠায় পেয়েছি। তাঁর নিজেরই অভিজ্ঞতা ছিল এ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার হিসেবে চার বছরের এমনই অনেকটা জঙ্গল-মহালের। তাই লেখকেরই বাস্তব দেখা বনের দৃশ্য, জোছনা ফোটা, সবুজের অবারিত কোল, অনুভূতি আমরা পাতায়-পাতায় পাই। লেখক তাঁর বয়ানে উপন্যাসের শেষে নিজেই জানান আমাদের,

“মানুষের বসতির পাশে কোথাও নিবিড় অরণ্য নাই। অরণ্য আছে দূর দেশে, যেখানে পতিত-পক্ব জম্বুফলের গন্ধে গোদাবরী-তীরের বাতাস ভারাক্রান্ত হইয়া ওঠে, ‘আরণ্যক’ সেই কল্পনালোকের বিবরণ। ইহা ভ্রমণবৃত্তান্ত বা ডায়েরি নহে-উপন্যাস। অভিধানে লেখে ” উপন্যাস” মানে বানানো গল্প। অভিধানকার পণ্ডিতদের কথা আমরা মানিয়া লইতে বাধ্য। তবে ‘আরণ্যক’-এর পটভূমি সম্পূর্ণ কাল্পনিক নয়।”

‘আরণ্যক’ লেখকের চতুর্থ উপন্যাস। এটি ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত। ১৯৩৭-৩৯ সালের মধ্যে লেখা। ১৯১৯ সালে ২৫ বছর বয়সে বিভূতিভূষণ বিয়ে করেন। এক বছর পর তাঁর স্ত্রী গৌরী দেবী মারা যান। এই গৌরী দেবীকেই ‘আরণ্যক’ উৎসর্গ করেন বিভূতিভূষণ। স্ত্রীর মৃত্যুর ২০ বছর পর লেখক দ্বিতীয় বিয়ে করেন ৪৬ বছর বয়সে। দ্বিতীয় বিয়ের আগের এই যে বিশটা বছর লেখকের জীবনের সেখানে প্রথম স্ত্রী হারানোর বেদনা, হারিয়ে ফেলা মেনে নেয়া, নিজেকে আড়াল করে রেখে প্রকৃতিতে মত্ত থাকা এগুলোর প্রভাব আরণ্যকে খুব বেশি মাত্রায় পেয়েছি। জঙ্গল-মহাল, বনশ্রেণী, পাখি, সবুজ, সেই এলাকার দারিদ্রপীড়িত সীমিত চাহিদার মানুষগুলো, নীল গাই, মহিষ, হরিণ, সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ে নিজেকে রেখে দেয়া, বাঘের ভয় ইত্যাদি প্রকৃতির কত প্রকট অনুষঙ্গ এখানে কতটা সহজাত হয়ে ছিল! লেখক বাস্তবে স্ত্রী হারানোয় যে অপূর্ণতায় ডুবে ছিলেন তাই ই যেন আরও স্পষ্ট করে রাখা ‘আরণ্যক’ লেখার মাধ্যমে প্রকৃতির তরে আশ্রয় নিয়ে।

পুরো উপন্যাস জুড়ে জঙ্গল- মহাল, বনানী, প্রকৃতির কথা। কি সহজাত বর্ণানায় স্পষ্ট করে দেখানো পাঠককে! কোন লুকাছাপা নেই, লেখক যেমন দেখেছেন তেমন যেন বয়ান করে গিয়েছেন যেন। সম্পর্কের জটিলতা নেই উপন্যাসে। ছয় বছরের বনের সুধা অর্জন পাঠকের চোখে-মুখে, গালে মাখিয়ে দিয়েছেন দুই হাত ভরে যেন কথক। প্রকৃতিই এই উপন্যাসের নায়ক যেন। কোথাও হাহাকার বোধ নেই, নেই কোথাও বিবর্ণনতার সূতো, শুধু আছে প্রকৃতির বর্ণনা, সেখানে থাকা মানুষগুলোওতো প্রকৃতির অংশ, তাদেরও বর্ণনা। লেখক বা কথক কেউ ই আবার এই প্রকৃতি থেকে উঠে আসা কেউ না। চির আউটসাইডারই তারা যেন বনের। কোলকাতা থেকে, শহরে কাটিয়ে থাকা জীবনকে নিয়ে এসে ছয়টা বছর বিরামহীন প্রকৃতি মগ্ন থাকা একজনের জীবনের গল্পই শুধু এই ‘আরণ্যক’ না, তার চেয়ে বেশি কিছু, সেটুকু ব্যাখ্যাতীত, পাঠকের অনুভব করে নিতে হবে। আরণ্যকে জুড়ে থাকা মুগ্ধতা জড়ানো কিছু বর্ণনা, বোধ, চিন্তা এখানে থাকুক।

“যে জিনিস যত দুষ্প্রাপ্য মানুষের মনের কাছে তাহার মূল্য তত বেশি। এ কথা খুবই সত্য যে, এই মূল্য মানুষের মনগড়া একটি কৃত্রিম মূল্য, প্রার্থিত জিনিসের সত্যকার উৎকর্ষ বা অপকর্ষের সঙ্গে এর কোন সম্বন্ধ নাই। কিন্তু জগতের অধিকাংশ জিনিসের উপরই একটা কৃত্রিম মূল্য আরোপ করিয়াই তো আমরা তাকে বড় বা ছোট করি।”

“যখন নিজের জঙ্গলের সীমানায় ঢুকি, তখন সুূূদূরবিসর্পী নিবিড়শ্যাম বনানী, প্রান্তর, শিলাস্তূপ, বনটিয়ার ঝাঁক, নীলগাইয়ের জেরা, সূর্যালোক, ধরণীর মুক্ত প্রসার আমায় একেবারে একমুহূর্তে অভিভূত করিয়া দেয়।”

“এই পথহীন প্রান্তরের শিলাখণ্ড ও শাল-পলাশের বনের মধ্য দিয়া এই রকম মুক্ত আকাশতলে পরিপূর্ণ জোৎস্নায় হু-হু ঘোড়া ছুটাইয়া চলার আনন্দের সহিত আমি দুনিয়ার কোনো সম্পদ বিনিময় করতে চাই না।”

“দূরে কোথায় বনের মধ্যে বন্য কুক্কুট ডাকিয়া উঠিল; অন্ধকার ও নিঃশব্দ আকাশ, অন্ধকার ও নিঃশব্দ পৃথিবী শীতের রাত্রে পরস্পরের কাছাকাছি আসিয়া কি যেন কানাকানি করিতেছে।”

“মানুষে কি চায়–উন্নতি, না আনন্দ? উন্নতি করিয়া কি হইবে যদি তাহাতে আনন্দ না থাকে? আমি এমন কত লোকের কথা জানি, যাহারা জীবনে উন্নতি করিয়াছে বটে, কিন্তু আনন্দকে হারাইয়াছে। অতিরিক্ত ভোগে মনোবৃত্তির ধার ক্ষইয়া ক্ষইয়া ভোঁতা–এখন আর কিছুতেই তেমন আনন্দ পায় না, জীবন তাহাদের নিকট একঘেয়ে, একরঙা, অর্থহীন। মন শান-বাঁধানো-রস ঢুকিতে পায় না।”

“অন্ধকারাবৃত বনপ্রান্তরের ঊর্ধ্বাকাশে অগণ্য নক্ষত্রালোক কত দূরের বিশ্বরাজির জ্যোতির দূতরুপে পৃথিবীর মানুষের চক্ষুর সম্মুখে দেখা দিত। আকাশে নক্ষত্ররাজি জ্বলিত যেন জলজ্বলে বৈদ্যুতিক বাতির মতো–বাংলা দেশে অমন কৃত্তিকা, অমন সপ্তর্ষমণ্ডল কখনো দেখি নাই। দেখিয়া দেখিয়া তাহাদের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় হইয়া গিয়াছিল। নিচে ঘন অন্ধকার বনানী, নির্জনতা, রহস্যময়ী রাত্রি, মাথার উপরে নিত্যসঙ্গী অগণ্য জ্যোতির্লোক। এক-একদিন একফালি অবাস্তব চাঁদ অন্ধকারের সমুদ্রে সুদূর বাতিঘরের আলোর মত দেখাইত। আর সেই ঘনকৃষ্ণ অন্ধকারকে আগুনের তীক্ষ্ণ তীর দিয়া সোজা কাটিয়া এদিকে ওদিকে উল্কা খসিয়া পড়িতেছে। দক্ষিণে, উত্তরে, ঈশানে, নৈঋতে, পূর্বে, পশ্চিমে, সবদিকে। এই একটা, ওই একটা, ওই দুটো, এই আবার একটা-মিনিটে মিনিটে, সেকেণ্ডে সেকেণ্ডে।”

পরিশেষে বলা এটুকুই, আরণ্যক অনন্য৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *