কাশ্মীরের কান্না — সমর ইসলাম

লেখক :
কাহিনী সংক্ষেপে:
ইসলামিক ব্রডকাস্টিং এজেন্সি বা আইবিএর ঢাকা ব্যুরোর প্রধান হাসান মাহমুদ। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তার নতুন অ্যাসাইনমেন্ট কাশ্মীর নিয়ে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান কারগিল যুদ্ধের ময়দান থেকে এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন তৈরি করা। তো যথারীতি জাতিসংঘের এক মেডিকেল টিমের অংশ হিসাবে মাহমুদ রওনা হয় কাশ্মীরে। শুরুর দিনগুলো ভালো কাটলেও যখন যুদ্ধ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে থাকে তখন মেডিক্যাল টিমের ইবরাহিম,আবদেল রহমান, এলিয়েদারাফিরে গেলেও আহত হওয়ার কারণে ফিরতে পারে না মাহমুদ।প্রথমে মুজাহিদদের স্থাপিত একটি অস্থায়ী হাসপাতালে এবং পরে তাকে আশ্রয় নিতে হয় ঐ অঞ্চলের মজাহিদ কমান্ডার শেখ ওসামার বাড়িতে।
ওসামাদের বাড়িতে এসেই মাহমুদের পরিচয় হয় তার বোন সেবিকা সুমাইয়ার সাথে। আর তখনই শুরু হয় মাহমুদের আসল যুদ্ধ দেখা। ইমেজ, ভিডিও আর নোটে সমৃদ্ধ হতে থাকে তার রিপোর্ট। একে একে তার পরিচয় হতে থাকে বৃদ্ধ মির্জা সাহেব, আব্দুর রহমান, নূরজাহান, আব্দুল করিম খানদের সাথে। সে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে থাকে সেখানে বাস করা সাধারণ মানুষদের জীবন, মুজাহিদদের সংগ্রামকে। আচমকা এক রাতের ঘটনা পাল্টে দেয় সমস্ত হিসেব নিকেশ। ভারতীয় বাহিনীর ক্র্যাক ডাউনে মারা পড়ে ওসামা আর তার মা। সুমাইয়ার পুরো দ্বায়িত্ব এসে পড়ে মাহমুদের উপর। এবার? মাহমুদ কিভাবে ওসামার শেষ ইচ্ছা অনুসারে সুমাইয়াকে ইসালামাবাদে পৌঁছাবে? সুমাইয়ার প্রতি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা অনুভূতিরই বা কি হবে? আর সেই যে না বলে চলে যাওয়া মাহমুদের জীবন ও উপলব্ধির ভক্ত হয়ে ওঠা এলিয়েদারই বা কি হবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
ভালো ছিল বইটা। তবে বইটা পড়ার আগেই আপনাকে যে বিষয়ে সাবধান করে দিতে চাই সেটা হল লেখক বইটা লিখেছেন কাশ্মীরের প্রতি সহানুভূতিশীল এক দৃষ্টি থেকে, তিনি তাঁর নায়ককে আশ্রয় দিয়েছেন এক ‘মুজাহিদ’র বাড়িতে। অর্থাৎ লেখকের একটা পক্ষপাত আপনি শুরু থেকেই দেখে থাকবেন। লেখক যেহেতু কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তাই স্বভাবতই তাঁর বর্ণনায় ওখানকার যোদ্ধারা ‘মুজাহিদ’ বলে বর্ণিত হয়েছে আর ভারতীয় সেনাবাহিনী বর্ণিত হয়েছে ‘দখলদার বাহিনী’ হিসেবে। আবার নায়ককে যেহেতু স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বনকারী মুসলিম হিসেবে দেখিয়েছেন তাই কাশ্মীরের চলতি ইসিহাসকে বলেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদী মিডিয়ার বয়ান।
বইটা পড়তে গিয়ে বারবার বুলবুল সরওয়ারের লেখা ‘ ঝিলাম নদীর দেশে’ বইটার কথা মনে পড়ছিল। ঐ বইয়ে যেমন লেখক কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন এখানেও লেখক বারবারই মুগ্ধ হয়েছেন কাশ্মীরের সৌন্দর্যে। অসাধারণ ভাষা আর বর্ণনাভঙ্গির কারণে বইটা খুব সহজেই আকৃষ্ট করে রেখেছে। বিভিন্ন কবিতা,গান,পরিসংখ্যান ব্যবহার করে লেখক বইটাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। আবার ভাষার ক্ষেত্রে আরবি-ফারসি শব্দের প্রচুর ব্যবহারও লক্ষ্যণীয়।
লেখক যে দিক থেকে কাশ্মীরের উপর আলোকপাত করেছেন অর্থাৎ এক মুজাহিদ কমান্ডার এবং কাশ্মীরের প্রতি সহানুভূতিশীল এক মুসলিম যুবক – তাতে বইটা বেশ আকর্ষণীয় হয়েছে। মুসলিম যুবকটি যেমন শুরু থেকেই কাশ্মীর সমস্যাটিকে ভারতের কারণে সৃষ্ট হিসাবে দেখাতে চেয়েছে ঠিক তেমনি মুজাহিদ কমান্ডার ওসামাও সেনাবাহিনীকে বর্ণনা করেছে নেতিবাচকভাবে। তাইতো তার বয়ানে যখন মির্জা সাহেব বা নূরজাহান বা আব্দুল করিমের দুর্দশার কথা এসেছে তখন সেটা অনেক মর্মস্পর্শী হয়ে উঠে এসেছে। বারবারই তাই কাশ্মীরীদের দুর্দশার সমস্ত দায় পড়েছে ভারতীয়দের উপর, লেখকের বর্ণনাভঙ্গির কারণেই সেনাবাহিনীর অপারেশনকে আমরা পেয়েছি নেতিবাচক হিসেবে আর প্রার্থনা করেছি মুজাহিদ কমান্ডারের জন্য যাতে সে ধরা না পড়ে। আবার কাশ্মীরীদের দুর্দশার চিত্র দেখে স্বাভাবিকভাবেই রাগটা পড়েছে ভারতীয়দের উপর।
বইটার আরেকটা আকর্ষণীয় বিষয় হলো এলিয়েদা এবং সুমাইয়া চরিত্র দুটি। এলিয়েদার রূপান্তর এবং মাহমুদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার বিষয়টি লেখক খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মধ্যে হওয়া সংলাপগুলো, দীর্ঘ চিঠিটা সবই বেশ আকর্ষণীয় ছিল। আর সুমাইয়া তো এই বইয়ে অনেকটা ‘ঝিলাম নদীর দেশে’ বইটার নাজনীন চরিত্রটার মতো হয়ে উঠেছে যদিও শেষটা একটু অন্যরকম ভেবেছিলাম।
তবে বেশ কিছু ঘটনা আরোপিত মনে হয়েছে। যেমনঃ আক্রমণের সময় মাহমুদের পিস্তল খুঁজে পাওয়া এবং বেশ কয়েকজন সেনাকে কুপোকাত করা, নদী পার হওয়ার পর সুমাইয়া অজ্ঞান হয়ে পড়লে ব্যাগে আগুন জ্বালানোর সরঞ্জাম পাওয়া বা পালানোর সময়ে সরাসরি মুজাহিদদের হাতেই পড়ার ঘটনাগুলো।
তো শেষ কথা যেটা বলা যায়, কাশ্মীরের ইতিহাসকে দেখার জন্য তো সবসময় দুটি পক্ষ বর্তমান। একপক্ষ যেখানে ভারতীয় বাহিনীকে দেখে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে দেশের অবিচ্ছিন্ন অংশকে মুক্ত করার শক্তি হিসেবে এবং অন্যপক্ষ কাশ্মীরীদের দেখে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত এক জাতি হিসেবে। তো আপনি যে পক্ষেরই হোন না কেন, বইটা আপনার পড়া উচিত। যদি আপনি প্রথম পক্ষের হোন তাহলে দেখতে পাবেন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কিভাবে সংঘটিত হচ্ছে তার বয়ান আর যদি দ্বিতীয় পক্ষের হোন তাহলে দেখতে পাবেন স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত এক জাতির সংগ্রামকে। তো দুই পক্ষকেই আমন্ত্রণ বইটা পড়তে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *