পাঠক মনের সরল প্রতিক্রিয়া…

উপন্যাস: পদ্মরাগ; ঔপন্যাসিক: বেগম রোকেয়া

পদ্মরাগ অতি মূল্যবান দুর্লভ পাথর, এর বিশেষত্ব এর কাঠিন্যে। নারী দুর্বল, অবলা। নিজ যোগ্যতায়, নিজ পরিচয়ে নিজ সম্মানে তার টিকে থাকা দুর্লভ। নারী শুধু সামাজিক বা অর্থনৈতিক কারণেই নয় আবেগীয় ভাবেও পুরুষের প্রতি নির্ভরশীল। বিত্তশালী কোন পরিবারেও যদি কখনো বিপর্যয় নেমে আসে তার প্রথম শিকার হয় নারী।

আয়েশা সিদ্দীকা যার প্রকৃত নাম জয়নব, এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। বিত্তশালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও সেত এই সমাজের বাইরে নয়।
তার বিয়ে হয় যে পরিবারে সেখানে তার মূল্যায়ন হয় সম্পদের ভিত্তিতে। তার স্বামী আলমাস পরিবারের চাপে অন্যত্র বিয়ে করে। নানা ঘটনার প্রতিঘাতে তিনি পুনরায় জয়নবকে প্রত্যাশা করেন কারণ জয়নব বা পদ্মরাগ তার ধর্মপত্নী। আর কে না জানে ধর্মপত্নীর উপর পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার। এই অধিকার স্বীকার করে সমাজ, পরিবার এবং নারী নিজেও। কি জোর আছে নারীর যে পুরুষ পূর্বে প্রত্যখ্যান করেছে সে যদি এসে ধর্মপত্নীর কাছে তার অধিকার দাবী করে তার দাবী ফিরিয়ে দেবার? সেই নারী যাবে কোথায়? কি হবে তার পরিণতি? কে হবে পরাশ্রয়ী অবলা নারীর আশ্রয়? সম্মান নারীর অর্জন নয়, সেত পুরুষের দয়া। সেই সম্মান অর্জন করার শক্তি ও সুযোগ নারীকে দেয়া হয়নি, বার বার নারীকে হীনবল বলে অপমান করা হয়েছে। সেই সময় নারীর জন্য বড় দুঃসময় ছিল, অমানুষের জীবণই ছিল নারীর ভবিতব্য।

সেই সময়ে রোকেয়া সাহস দেখিয়েছিলেন লতিফ আলমাসকে প্রত্যাখ্যান করার। দৃপ্তস্বরে সিদ্দিকা বলেছিল ” তাহারা আমার সম্পত্তি চাহিয়াছে আমাকে চায় নাই। আমরা কি মাটির পুতুল পুরুষ যখন ইচ্ছা করিবে আবার যখন ইচ্ছা গ্রহণ করিবে?

এই একবিংশ শতকে এসেও পদ্মরাগদের জন্য সমাজ প্রস্তুত হয়নি। তবুও রোকেয়াকে ধন্যবাদ এই একবিংশ শতকে এসে যে সিদ্ধান্ত নিতে নারীর বুক কাঁপে সেই সাহসী উচ্চারণ তিনি ঊনবিংশ শতকে করে গেছেন। এই উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বলে গেছেন হে ভগিনীগণ পুরুষের পদদলিত হওয়াই তোমার জীবণের অভীষ্ট্য নয়, তুমি বাঁচো সম্মানের সাথে মানুষের মত করে। পদ্মরাগ শুধু তার সময়ে দুর্লভ ছিলনা তা আজও দুর্লভ।

আজ ০৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়ার জন্মদিন, তাকে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম । আর খুব সাধারণ মেয়ে হিসেবে কৃতজ্ঞতা। উনি আমার মত শত সহস্র কন্যাকে মানুষের মর্যাদা দিতে চেয়েছিলেন যখন তারা মানুষ হিসেবে বিবেচিত না হয়ে শুধুই মেয়ে মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতেন। সেই দুঃসময়ে তিনি সহস্র কন্যার দুঃখ নিজের মধ্যে ধারণ করে, অপমান বিরোধিতা সহ্য করেই পথ চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পথ তৈরি করার জন্য, আমার পথ তৈরির জন্য। আজ শত বর্ষ পরে তাকে জানাই কৃতজ্ঞতা। আমি জানি আজ যদি তিনি দেহ ধারণ করে থাকতেন তবে মেয়েদের আজকের অবস্থান দেখে তিনি আনন্দিত হতেন আর আনন্দিত হতেন আমার মত অসংখ্য মেয়ের মধ্যে তার আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে যেতে দেখে। যেখানে সমাজ ও পরিবারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মেয়েরা নিজের আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে সাহস করে।