ক্ষত্রবধু — বাণী বসু

গান্ধারী-কুন্তী-মাদ্রী মহাভারতের তিন রাজবধূর ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবণের কাহিনী। আসলে নারী হয়ে জন্মানোই তো ভাগ্যের বিড়ম্বনা। পিতৃগৃহে তাদের শিখতে হয়েছিল গৃহকর্ম, রন্ধন, অতিথিসেবা, চিকিৎসা আরো নানাবিধ লোকাচার কিন্তু রাজনীতির শিক্ষা তারা পিতৃগৃহে পাননি। অথচ রাজনীতির জটিল আবর্তে পড়েই তাদের কাটাতে হল পুরো জীবন।

অভিমানী গান্ধারী নিজের দেশকে বাঁচাতে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে পতিরূপে স্বেচ্ছায় বরণ করে নিলে কিন্তু নিজের চোখে সারাজীবনের ন্যায় বেঁধে নিলে পট্টি। হে রাজকন্যা তোমার অভিমানে কী আসে যায়, তুমিত শুধুই গৃহবধূ… হলেইবা রাজবধূ তাতেই বা কী আসে যায়, তুমিত পুরুষ নও! তোমার শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা এগুলোর কোন প্রয়োজন নেই, তুমি বরং অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের চোখের দায়িত্ব পালন করতে পারতে আর সেটাই ছিল কাম্য। তুমি নিজের চোখে নিজের জ্যোতিতে পৃথিবী দেখতে চাওয়ার ধৃষ্টতা না দেখিয়ে বরং ভালই করেছ।

রাজবধূ হয়ে দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে পাণ্ডু রাজের ঘরে এলে রাজকন্যা। কিন্তু তুমিত জানতে না ভাগ্য তোমাকে কোথায় নিয়ে যাবে। যে রাজগৃহে তুমি বধূ হয়ে এলে সেখানে তোমার মূল্য পুত্র সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে। তুমি পুত্র সন্তান জন্মদান না করতে পারলে এই সংসারে তুমি অপাঙক্তেয়। তাই পুত্র জন্মদান না করার অপরাধে তোমার ঘরে যখন সপত্নী এলো তুমি বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলে, তোমার অপরাধ তুমি বুঝতেই পারলে না। তারপর তুমি রাজনীতি শিখলে, সংসার করতে গেলেও যে রাজনীতি জানতে হয় পদে পদে ঠেকে ঠেকে তুমি তা শিখে নিলে। মহাভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী রূপে তাই টিকে গেলে তুমি। রাজনীতি শিখেছিলে বলেই তুমি জানতে স্বামীকে সব জানাতে নেই, পুরুষকে বিশ্বাস করতে নেই। পুরুষ আসলে আশ্রয়স্থল নয়, পুরুষ আশ্রয় প্রার্থী। সংসারে থাকতে গেলে কৌশলী হতে হয়, ছল করাতে কোন অপরাধ নেই বরং যে নারী ছল করতে জানে না তার সমূহ বিপদ, তার অস্তিত্ব হুমকীর সম্মুখীন। হে রাজকন্যা তোমাকেই আদর্শ মানা উচিৎ সকল নারীর। পুরুষ মূঢ়, তাকে তুমি ধিক্কার জানাও মনে মনে কিন্তু প্রকাশ্যে নয়। নারীর সততা, ব্যক্তিত্ব পুরুষের কামনীয় নয়।

হাসি খুশি প্রাণবন্ত মেয়েটা বিয়ের দিন কল্পনাও করতে পারেনি তার ভবিতব্য। একটা জীবন তার এক অক্ষম পুরুষের সেবা করেই কেটে যাবে। ছাড়তে হবে তাকে রাজবধূর আয়েস আর রাজকন্যার বিলাসিতা। সেই পুরুষের সঙ্গ দিতে গিয়ে কৃচ্ছ্ব সাধন করেই কেটে গেল তার গোটা জীবন, রাজপুরীতে আর ফেরা হলো না তার।

এক নিঃশ্বাসে পরে নেবার মত বই। চাইলেই কেউ পড়ে নিতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *